সরফভাটার মিরেরখীলে কৃষক নেজাম কে দুইহাত কেটে হত্যা। পর পর দুই খুন।

দক্ষিন রাংগুনিয়ার সরফভাটায় মিরেখীলে কৃষক নেজামকে নৃশংসভাবে হত্যা, বিচ্ছিন্ন দুই হাত

ধানখেত পাহারা দিতে গিয়ে প্রাণ গেল কৃষকের, কৃষিজমি নিয়ে বিরোধের গুঞ্জন—পরপর দুই হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ

এস. এম. সামাউল ইসলাম

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নে আবারও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এবার বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় ধানখেত পাহারা দিতে গিয়ে নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন মো. নেজাম উদ্দিন (৪৫) নামের এক কৃষক। ২৭ অক্টোবর রাতে বাড়ি থেকে জমি পাহারা দিতে বের হওয়ার পরদিন সকালে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের দুই হাত বিচ্ছিন্ন এবং গলায় রশি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।

নিহত নেজাম উদ্দিন সরফভাটা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সুইসগেট এলাকার বাসিন্দা। তিনি মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। তাঁর স্ত্রী পারভিন আক্তার (৩৬)। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলে পারভেজ এবং মেয়েরা হলেন জেসি আক্তার ও জেসমিন আক্তার।

জীবিকার তাগিদে পাহাড়ি এলাকায় ধান চাষ

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নেজাম দীর্ঘদিন ধরে গরু-ছাগল পালন ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বাড়ি থেকে বেশ দূরের পাহাড়ি এলাকায় তিনি ধান চাষ করতেন। বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রায়ই রাতে জমি পাহারা দিতে যেতেন তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে ধানখেত পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন নেজাম। কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল হলেও তিনি বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হন।

একপর্যায়ে চাষাবাদের জমি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহের দুই হাত বিচ্ছিন্ন ছিল এবং গলায় রশি প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

ব্যক্তিগত বিরোধের কথা জানেন না স্ত্রী, উঠছে জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ।

নিহতের স্ত্রী পারভিন আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল বলে তিনি জানতেন না। এ ঘটনায় কাকে সন্দেহ করবেন, সে বিষয়েও তাঁরা নিশ্চিত নন।

তবে স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, কৃষিজমি নিয়ে বিরোধ এবং বাড়ি নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।

এদিকে, ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। ভয়ে নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরপর দুই হত্যাকাণ্ডে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সরফভাটা এলাকায় পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।

একই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে এমন নৃশংস ঘটনার পর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও অপরাধীদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

পুলিশের বক্তব্য

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকেও থানায় মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানা গেছে।

কেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন কৃষক নেজাম উদ্দিন? কৃষিজমি নিয়ে বিরোধ, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়। দ্রুত রহস্য উদ্‌ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং নিহতের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা।